আতাতুর্ক কামাল পাশা

মেহরাব রহমান একজন শুদ্ধ কবি হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত। ইতিমধ্যে কমপক্ষে বারটি কবিতার বই তাঁর প্রকাশ হয়েছে। কবিতায় তিনি শুদ্ধচিত্ত। কবি জীবনানন্দ দাস ও সিকদার আমিনুল হক ঘরনার কবি। কবিতাকে তিনি কবিতার স্থানে রাখতে চান। কবিতার সাথে খুব কমই রাজনীতি বা সমাজনীতি ইত্যাদি মেশাতে আগ্রহী তিনি। তবে কবিতার প্রয়োজনে কখনো কখনো এসবের ছায়া তার কাব্যে আসে। কিন্তু তাঁর আরো কিছু বাইরের জগৎ আছে, সে জগৎটি আমাকে বেশ তৃপ্ত করে।
সম্প্রতি টরন্টো থিয়েটার ফেস্টিভাল ২০১৯ পালিত হল কানাডার টরন্টোতে। অন্যথিয়েটার টরন্টো, বাংলাদেশ থিয়েটার টরন্টো ও থিয়েটার ফোকাস আয়োজিত দু’দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠান পালন করল বেশ জাঁকজমকের সাথে। বিকেল ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত আড্ডা, নৃত্য, ঢোল-বাজনা, সেমিনারসহ এবং সর্বমোট ৭টি নাটক মঞ্চস্থ হয়।
প্রথমদিন বিখ্যাত তবলাশিল্পী তানজীর আলম রাজীবের ঢোল বাদনের মধ্যে দিয়ে নাট্য উৎসবের যাত্রা শুরু হয়। এরপর প্রথম দিনের সেমিনার “অভিবাসীর নাট্যচর্চাঃ বাঙালীর রূপ-অরূপের খোঁজ” বিষয়ে মূল নিবন্ধ মিথুন আহমেদ পাঠ করেন। প্রবন্ধের উপর প্রাণবন্ত আলোচনা করেন কবি আসাদ চৌধুরী এবং হাসান মাহমুদ।
সেমিনারের পর সুকন্যা নৃত্যাঙ্গনের পর পর ছয়টি নৃত্য পরিবেশিত হয়। নৃত্যের পর প্রথম দিনের প্রথম নাটক অন্যথিয়েটার টরন্টো-এর ৯ম প্রযোজনা লুৎফর রহমান রিটনের রচনা, জাহিদ হোসেনের সঙ্গীত পরিচালনায়, তীর্থংকর মহলানবিশের আলোক পরিকল্পনায়, ফারহানা শান্তার একক অভিনয়ে মঞ্চস্থ হয় “আত্মহননের পূর্বরাত্রিতে” । নাটকটি নির্দেশনা দেন আহমেদ হোসেন। এরপর মঞ্চস্থ হয় থিয়েটার ফোকসের প্রযোজনায় “টেলস অফ বাংলাদেশী ডায়াস্পোরা”। নাটকটি পরিচালনা করেন আরিফ ভূইয়াঁ, পারভেজ চৌধুরী, নয়ন হাফিজ, ইমামুল হক। তারপর মঞ্চস্থ হয় আমেরিকা থেকে আগত ডিসি মেট্রো থিয়েটারের প্রযোজনায় উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের “হ্যামলেট”-এর আলী যাকেরের রূপান্তরিত “দর্পণ” নাটক। এটি নির্দেশনা দেন জাফর রহমান। প্রথমদিনের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চয়ন দাস। দ্বিতীয়দিন স্লাইড প্রদর্শনীর পর সেমিনার “বাংলা নাট্যচর্চা দেশে বিদেশে” অনুষ্ঠিত হয়। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন আকতার হোসেন আর এতে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সিডনি থেকে আগত অতিথি বিশিষ্ট নাট্যকর্মী, অভিনেতা জন মার্টিন। আলোচনায় আরও অংশগ্রহণ করেন ইমামুল হক ও আহমেদ হোসেন। এরপর মঞ্চস্থ হয় টরন্টো বেঙ্গলি ড্রামা গ্রুপ”-এর “হঠাৎ দেখা”। নাটকের নির্দেশক ছিলেন অপরাজিতা দাস। দ্বিতীয়দিনের দ্বিতীয় নাটক ছিলো ইতিহাস, দেশ সমাজ প্রযোজিত আকতার হোসেনের রচনা এবং নির্দেশনায় “ইচ্ছাপূরণ”। তারপর মঞ্চস্থ হয় বাংলাদেশ থিয়েটার টরন্টো-এর নাটক “এক যে ছিল দুই হুজুর”। রচনা রবিউল আলম আর নাটকটি নির্দেশনা দেন হাবিবউল্লাহ দুলাল এবং রবিউল আলম। শেষদিনের শেষ নাটক ছিলো অন্যথিয়েটার টরন্টো-এর ১০ম প্রযোজনা “অতঃপর হরেন মন্ডল”। বিমল বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই নাটকের নির্দেশনা দেন বাহারউদ্দিন খেলন এবং প্রযোজনায় ছিলেন আহমেদ হোসেন।


এ নাটকের বেশ কিছু ভিডিও চিত্র আমার চোখে আসে। সত্তরের কবি মেহরাব রহমান দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় রয়েছেন।গতবার একুশে মাঠে তাঁর সাথে বেশ কিছু আলাপ হয় আমার।তাঁর কবিতার প্রুতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা। কিন্তু এবার হরেন মন্ডলের ভূমিকায় তাঁকে অভিনয় করতে দেখে বেশ ভাল লাগল। তিনি এত্তো সুন্দর পেলব মনমুগ্ধকর অভিনয় করতে পারেন যা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন হয়। একজন কবি যখন সত্যিকারভাবে মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, বঞ্চনা নিজের মাঝে আনুভব করতে পারেন, তখন যে তা কতো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে আমাদের চোখে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
বিদেশের মাটিতে যারা বাংলাদেশকে তুলে ধরেন, তাঁরা প্রবাসী হলেও দেশমাতার সন্তান। হরেনের নাম-ভূমিকায় কবি মেহরাব রহমান সেটাই প্রমাণ করলেন।